বড়পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রা) রিয়াজত ও ইবাদত

1
512
বড়পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রা) রিয়াজত ও ইবাদত
বড়পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রা) রিয়াজত ও ইবাদত
Advertisements
Rate this post

বড়পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রা) রিয়াজত ও ইবাদত

হযরত সৈয়দ আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলায়হি ৪৭০ হিজরি মোতাবেক ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে জিলান নামক এক ছোট শহরে ১ রমযান জুমাবার রাতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ৯১ বছর হায়াত পান। অতএব তিনি ৫৬১ হিজরি ১১ রবিউস সানি ওফাত বরণ করেন। তিনি ছিলেন মাতৃগর্ভের ওলী। সাথে সাথে তিনি বেলায়তের সর্বোচ্চ আসনে আসিন হয়েছেন তাঁর কঠোর সাধনা ও প্রচুর ইবাদতের মাধ্যমে। এ প্রবন্ধে গাউসে পাকের রিয়াজত ও ইবাদতের বর্ণনা তুলে ধরার প্রয়াস পাব ইনশা-আল্লাহ্ ।

১. মাতৃগর্ভে সাধনা

কুরআনুল করিমের আয়াত ও হাদিসে পাক দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, পিতার মেরুদন্ড ও মায়ের বক্ষ হতে যে নুতফা বের হয় সেটা মায়ের রেহেমে বাচ্চা দানির ভেতর প্রবেশ করলে প্রথমে চল্লিশ দিন নুতফা আকারে, দ্বিতীয় চল্লিশ দিনে আলাক্বা (রক্তের টুকরা) এবং তৃতীয় চল্লিশ দিনে মুদগা (গোশতের টুকরা) হয়। তিন চল্লিশ এক শত বিশদিন অর্থাৎ চার মাস অতিবাহিত হলে আল্লাহ্ তা’আলা এক জন ফেরেশতা পাঠিয়ে সে গোশতের টুকরাকে প্রাণ দেন।

প্রাণ তথা রূহ দেওয়ার পর হতে আরো পাঁচ মাস দশ দিন মায়ের পেটে জীবিত অবস্থায় থাকে। গাউসে পাক মায়ের পেটে গ্রহ পাওয়ার পর হতে দুনিয়াতে আসার পূর্ব পর্যন্ত যে পাঁচ মাস দশ দিন মায়ের পেটে অবস্থান করেন, সে সময় মায়ের কুরআন তেলাওয়াত শুনে শুনে তিনি কুরআনুল করিমের প্রথম পারা হতে আঠার পারা পর্যন্ত কুরআন মুখস্থ করেন। এটা তার মায়ের পেটের সাধনা নয় কি?

Advertisements

২. মায়ের পেট হতে ভুমিষ্টের পর সাধনা

হুজুর গাউসে পাক ১ রমযান জুমাবার রাতে জন্মগ্রহণ করেন অর্থাৎ যে সন্ধ্যায় রমজানের চাঁদ দেখা গেছে সে সন্ধ্যার রাতে (যা রমজানের প্রথম রাত) জন্মগ্রহণ করেন। সে প্রথম রাতের সোবহে সাদেক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ে

মায়ের দুধ পান না করে দুনিয়াতে এসেই তিনি রোযার মতো সর্বাধিক সওয়ার বিশিষ্ট ইবাদত আরম্ভ করে দিয়েছেন। এভাবে প্রতি রমজান মাসের সোবহে সাদেক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত প্রতিদিন মায়ের দুধ ও পানাহার বর্জন করেছিলেন।

৩. ইলম অর্জনে সাধনা

বর্ণিত আছে যে, গাউসে পাকের বয়স যখন পাঁচ বছর হয় তখন তাঁর মাতা তাঁকে স্থানীয় মরুতবে নিয়ে যান। দশ বছর বয়স পর্যন্ত প্রাথমিক ইলমে দ্বীন অর্জন করেন ।

৪. উচ্চতর ইলমে দ্বীন অর্জনে সাধনা

হুজুর গাউসে পাকের বয়স প্রায় আঠার বছর। একদিন তিনি ভ্রমণের জন্য ঘর হতে বের হলেন। সে দিন ছিল আরফার দিন অর্থাৎ জিলহজ্বের ৯ তারিখ। রাস্তা দিয়ে কোন কৃষকের ষাঁড় যাচ্ছিল। তিনি সে ষাঁড়ের পেছনে পেছনে যাচ্ছিলেন। সে একলা ষাঁড় গরুটি তাঁর দিকে দৃষ্টিপাত করল ওই গরুটির জবান দিয়ে বলতে লাগল তোমাকে এ জন্য অর্থাৎ গরুর পেছনে হাঁটার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি এবং আদেশও দেয়া হয়নি।

এ কথা থেকে বুঝতে পারলেন আরো উচ্চতর ইলমে দ্বীন হাসিল করতে হবে । তাই তিনি ষাঁড়ের এ কথা মাকে বলে উচ্চতর ইলমে দ্বীনার্জনের মরকম বাগদাদ যাওয়ার জন্য মায়ের অনুমতি চাইলেন। মায়ের অনুমতি লাভ করে বাগদান পৌঁছে বাগদাদের মাদরাসায়ে নেজামিয়ায় উচ্চতর দ্বীনি ইলম অর্জন শুরু করে দিলেন। ইলমে ফিকহ উসূলে ফিক্হ এর ইলম হযরত শেখ আবুল ওফা আলী ইবনে আকিল হাম্বলি, আবুল হাসান মুহাম্মদ ইবনে কাজি আবু আলী, শেখ আবুল খাত্তার এবং কাজি আবু সাঈদ মোবারক ইবনে আলী মাথযুমি হতে পরিপূর্ণ করেন। ইলমে হাদিস কালের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসিন হতে অর্জন করেন। নেজামিয়া মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার পর হতে আট বছর সময়ে তিনি সকল ইলমের পরিপূর্ণতার সনদ লাভ করেন ।

৫. ইলম অর্জনকালে কঠোর কষ্ট স্বীকার

গাউসে পাক বলেন, ইলমে দ্বীন অর্জনে আমাকে এত অসংখ্য বিপদ-আপদ বরদাস্ত করতে হয়েছে যে, যখন
আপদ বিপদ আমাকে চারপাশ থেকে ঘিরে নিতো তখন আমি পবিত্র কুরআনের আয়াতে করিমা (নিশ্চয় সংকির্ণতার সাথে সহজতা আছে, অর্থাৎ দুঃখের সাথে সুখ আছে) তেলাওয়াত করতে থাকতাম। এ আয়াত পড়াতে আমার অন্তরে শান্তি হাসিল হতো এবং যখন আমি জমি থেকে উঠতাম তখন আমার সকল বিপদ-আপদ দূর হয়ে যেতো।

বড়পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রা) রিয়াজত ও ইবাদত

৬. ইরাকের মরুভূমিতে চল্লিশ বছর সাধনা

গাউসে পাক যখন পূর্ণ যৌবনে পদার্পণ করেন তখন তিনি রেয়াজত ও ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলার পরিচায় লাভে ইরাকের জন-মানব শূন্য গভীর প্রান্তরে অবস্থান করেন। দিন ও রাতে পূর্ণ বিপদ সংকুলল স্থানে ঘুরাফেরা করতে থাকেন। একবার তিনি নিজেই বলেন, ‘আমি চল্লিশ বছর ইরাকের মরুভূমি ও গভীর জঙ্গলে ঘুরাফেরা করেছি। চল্লিশ বছর ধরে এশারের নামাযের শুধু দ্বারা ফজরের নামায পড়েছি এবং পনের বছর এশারের নামাযের পর এক পায়ে দাঁড়িয়ে এক খতম কুরআন আদায় করেছি। এ সময়ে কখনো কখনো পানাহার ব্যতীত তিন থেকে চল্লিশ দিন পর্যন্ত দিনাতি পাত করেছি।

গাউসে পাক বরজে আজমি নামক স্থানে এগার বছর অবস্থান করে রিয়াজত করেন। এ সময় তিনি প্রতিজ্ঞা করেন যে, যতক্ষণ তাঁকে কেউ খাওয়াবেন না ততক্ষণ তিনি নিজ হাতে খাবেন না। যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ তাকে পান করাবেন না ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি স্বীয় হাতে পান করবেন না। এভাবে বিনা পানাহারে চল্লিশ দিন পর একজন লোক কিছু খাবার এনে তাঁর সামনে রেখে চলে গেলেন। তাঁর নফস খানাগুলো খাওয়ার মনস্থ করলেন। কেননা ক্ষুধা সহ্যের বাইরে চলে গেল।

সাথে সাথে তিনি নিজে নিজে বলে উঠলেন, ‘আল্লাহর শপথ, আমি আল্লাহ্ তা’আলাকে যে ওয়াদা দিয়েছি, এটা থেকে ফিরে আসবো না। তখন তিনি তার পেটের ভেতর হতে আওয়াজ শুনতে পেলেন, ক্ষুদা ক্ষুদা। ইত্যবসরে গাউসে পাকের পীর মুর্শিদ শেখ আবু সাঈদ মানুষী তথায় আসলেন এবং তিনি গাউসে পাকের পেটের আওয়াজ শুনলেন। প্রশ্ন করলেন, হে আব্দুল কাদের। এটি কিসের আওয়ায়। গাউসে পাক উত্তর দিলেন, এটি নফসের অস্থিরতা ও বিচলতা । রূহ আল্লাহ্ তা’আলাকে মোশাহাদা করে স্থির আছে। তখন তিনি (আবু সাঈদ) বললেন, আমার ঘরে চলো । এ বলে তিনি চলে গেলেন। কিন্তু তিনি

চাইলেন। মায়ের অনুমতি লাভ করে বাগদাদ পৌঁছে বাগদাদের মাদরাসায়ে নেজামিয়ায় উচ্চতর দ্বীনি ইলম অর্জন শুরু করে দিলেন। ইলমে ফিকহ উসুলে ফিক্হ এর ইলম হযরত শেখ আবুল ওফা আলী ইবনে আকিল হাদলি, আবুল হাসান মুহাম্মদ ইবনে কাজি আবু আলী, শেখ আবুল গান্ডার এবং কাজি আবু সাঈদ মোবারক ইবনে আলী মাথযুমি হতে পরিপূর্ণ করেন। ইলমে হাদিস কালের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসিন হতে অর্জন করেন। নেজামিয়া মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার পর হতে আট বছর সময়ে তিনি সকল ইলমের পরিপূর্ণতার সনদ লাভ করেন ।

ইলম অর্জনকালে কঠোর কষ্ট স্বীকার গাউসে পাক বলেন, ইলমে দ্বীন অর্জনে আমাকে এত অসংখ্য বিপদ-আপদ বরদাস্ত করতে হয়েছে যে, যখন

(গাউসে পাক) গেলেন না, কেননা তিনি জানেন নিজ হাতে খেতে হবে। ইতোমধ্যে হযরত খিজির আলায়হিস্ সালাম আসলেন এবং নির্দেশ দিলেন, হে আব্দুল কাদের। ওঠ এবং আবু সাঈদের কাছে যাও। তখন গাউসে পাক আৰু সাঈদ মাখযুমীর ঘরের দিকে গেলেন। আবু সাঈদ মাখযুমী ঘরের দরজায় গাউসে পাকের অপেক্ষায় আছেন। গাউসে পাককে মাধ্যমী হুজুর দেখে বলে উঠলেন হে আব্দুল কাদের! আমার বলা কি যথেষ্ট হয়নি। আবার খিজির আলায়হিস সালামকে বলতে হয়েছে। তখন মাখমী হুজুর গাউসে পাককে ঘরের ভেতর নিয়ে গেলেন এবং নিজ হাতে খাওয়ায়ে দিলেন। গাউসে পাক বলেন, ‘এতে আমি পরিতৃপ্ত হয়ে গেলাম?

৭. শয়তানের প্রতারণা থেকে ঈমান রক্ষা

গাউসে পাক বলেন, একবার আমার সামনে একটি আলো (নূর) প্রকাশ পেলো। এতে আসমানের প্রান্ত আলোকিত হয়ে গেল। সে নূর হতে একটি আকৃতি দৃশ্যমান হলো। সে আকৃতি আমাকে সম্বোধন করে বললো, হে আব্দুল কাদের! আমি তোমার রব! (প্রভু) (আমি তোমার জন্য সমস্ত হারামকে হালাল করে দিলাম) গাউসে পাক বলেন, তখন আমি আউযুবিল্লাহি মিনাশ শায়তিনর রাজিম বললাম ” সাথে সাথে সে আলো দূর হয়ে গেল।

তিনি শুনতে পেলেন, হে আদুল কাদের! তোমাকে তোমার ইলম আমার ধোকা হতে রক্ষা করেছে। না হয় আমি আমার এ প্রতারণা দ্বারা সত্তরজন সৃষ্টিকে পথভ্রষ্ট করেছি। গাউসে পাক বললেন, ‘এটা আমার দয়াল মাওলার দয়া, যা আমার ভাগ্যে জুটেছে। গাউসে পাককে প্রশ্ন করা হলো আপনি কীভাবে বুঝতে পারলেন, এটা শয়তান, তখন গাউসে পাক উত্তর দিয়েছেন, শয়তানের কথা (হারাম কে হালাল করে দিলাম) থেকে বুঝতে পারলাম। কেননা আল্লাহ্ হারামকে হালাল করেন না ।

৮. চল্লিশ বছর ওয়াজ করেন

সৈয়্যদুনা আব্দুল ওয়াহাব বলেন, হুজুর গাউসুল আজম আব্দুল কাদের জিলানি রহমাতুল্লাহি আলায়হি চল্লিশ বছর যাবৎ অর্থাৎ ৫২১ হিজরি হতে ৫৬১ হিজরি পর্যন্ত ওয়াজ ও নসিহত করেন। তিনি সপ্তাহে তিনদিন (জুमা, মঙ্গল ও বুধবার) ওয়াজ ও নসিহত করতেন। হযরত ইব্রাহিম বিন সাঈদ বলেন, ‘গাউসে পাক আলেমানা পোশাক পরিধান করে উঁচু জায়গায় আসিন হয়ে ওয়াজ করতেন। ফলে শ্রোতাগণ তাঁর বাণী গভীর মনে শুনতেন এবং আমল করতেন।

বড়পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রা) রিয়াজত ও ইবাদত

৯. গাউসে পাকের ওয়াজের প্রভাব

গাউসে পাকের ছাত্র শেখ আব্দুল্লাহ জুবায়ী বলেন, তাঁর উপদেশে এক লাখের অধিক পথভ্রষ্ট এবং বদ আকিদার লোক তার কাছে তাওবা করেন এবং হাজার হাজার ইহুদী ও নাসারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন।

বৈবাহিক জীবন

গাউসে পাক বলেন, ‘রাসূরে পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের অনুসরণের জন্য বিবাহ করার ইচ্ছা ছিল। তবে তা আমার ইবাদত ও রেয়াজতের মধ্যে বাধা সৃষ্টি করবে এ ভয়ও ছিল। তবে আল্লাহ্ তা’আলা প্রত্যেক কাজের একটি সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সুতরাং যখন সে সময় আসল, তখন আল্লাহ্ তা’আলার দয়া ও মেহেরবাণীতে আমার সাদী হয়ে গেল। আল্লাহ্ তা’আলা আমাকে চারজন স্ত্রী দান করেছেন। তা সত্ত্বেও ইবাদত ও রেয়াজতে কোন কমি হয়নি।

তার শান, মান, ইবাদত, রেয়াজত, কেরামত, সাধনা, জিহাদ বর্ণনাতীত। কেননা তিনি তো আল্লাহ্ তা’আলার ওলী । গাউসে পাক তাঁর স্বরচিত কিতাব এর মধ্যে একটি হাদীসে কুদছি এনেছেন- (আমার অলিগণ আমার কুদরতের চাদরের নিচে তাঁদেরকে আমি ব্যতীত অপর কেউ চিনতে পারে না ।) সকল অলি আল্লাহ্ তা’আলার গুপ্ত রহস্য তাঁদেরকে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়। তাদেরকে জানেন, চিনেন, একমাত্র আল্লাহ তা’আলা মানুষ তাদেরকে চেনা, জানা সম্ভব নয়।

তথ্য সংগ্রহ,

১. সীরতে গাউসে আজম, আলম ফকরী,

২. জ্বালামিদুল জাওয়াহের,

৩. বাহজাতুল আসরার,

৪. সিররুল আসরার,

৫. আজকারুণ আবরার,

৬. খোলাসাতুল মাফাখের,

৭. আখবারুল আখয়ার

তথ্য সংগ্রহঃ মাসিক তরজুমানে আহলে সুন্নত

দরুদে তাজ শরীফের ফযীলত বাংলা উচ্চারণ ও বাংলা অর্থ সহ PDF Download

Leave a Reply