গাজী সালাহউদ্দীনের দুঃসাহসিক অভিযান প্রথম পর্ব

1
260
আল-আকসা বিজয়ে গাজী সালাহউদ্দীনের দুঃসাহসিক অভিযান
আল-আকসা বিজয়ে গাজী সালাহউদ্দীনের দুঃসাহসিক অভিযান
Advertisements
Rate this post

গাজী সালাহউদ্দীনের দুঃসাহসিক অভিযান প্রথম পর্ব

জাদুল আসাদীর তাঁবুতে বিশ্রাম নিচ্ছেন সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী। হেলমেট খুলল না। তাঁবুর বাইরে সশস্ত্র দেহরক্ষীরা পাহারা দিচ্ছে। কিছুক্ষণের জন্য প্রহরীর কমান্ডার সরে গেল। একজন প্রহরী পর্দা ভেদ করে তাঁবুতে উঁকি দিল। দেখল সুলতান চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন। গার্ড বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা চার সঙ্গীর দিকে তাকাল। সে চোখ বন্ধ করে আবার চোখ খুলল। দেখল বাকি চার দেহরক্ষী অন্যদের সাথে গল্পে মেতে উঠল।

গাজী সালাহউদ্দীনের দুঃসাহসিক অভিযান প্রথম পর্ব
গাজী সালাহউদ্দীনের দুঃসাহসিক অভিযান প্রথম পর্ব

প্রথম প্রহরী তাঁবুতে প্রবেশ করল। সে ছোরাটা হাতে নিল। বিড়ালের মতো নিঃশব্দে সে ঘুমন্ত সুলতানের দিকে এগিয়ে গেল। ছুরি উচিয়ে সুলতানের দিকে লক্ষ্য করে আঘাত করার জন্য নিচে নেমে আসতে লাগল । ঠিক সেই মুহুর্তে সুলতান পাশ ফিরিয়ে নেই । রক্ষীর আঘাত লাগল সালাহউদ্দিন আয়ুরির হেলমেটে । বিদ্যুতের গতিতে উঠে দাঁড়ালেন সালাহউদ্দিন আইয়ুবী। কিছুক্ষণের মধ্যেই সম্পূর্ণ ঘটনা বুঝে গেলেন। তার নির্বাচিত দেহরক্ষীর আক্রমণ করা দেখে তিনি হতবাক হননি।

হেলমেটের পাশ দিয়ে কেটে মাটিতে আটকে যাওয়া খঞ্জরটি বের করছিলেন গার্ড। সালাহউদ্দিন পুরো শক্তি দিয়ে গার্ডের মুখে ঘুষি মারেন। হাড় ভাঙ্গার শব্দ হল। প্রহরী বিকট শব্দ করে পরে গেল। সালাহউদ্দিন আইয়ুবী প্রহরীর কাছ থেকে পড়ে যাওয়া ছুরিটি তুলে নিলেন। চিৎকার শুনে বাইরে থেকে দুজন রক্ষী ছুটে আসেন। “তাকে বাঁচতে দাও।” সুলতান নির্দেশ দিলেন। কিন্তু তারা সুলতানের আদেশ অমান্য করে উল্টো সুলতানকেই আক্রমণ করে। আইয়ুবি দুই রক্ষীর তরবারির মুখোমুখি হয়েছিল একটি ছোরা দিয়ে। তাঁবুর ভেতরে তুমুল লড়াই শুরু হল।

Advertisements

দু-এক মিনিটের মধ্যে অন্য রক্ষীরাও ঢুকে পড়ে। কয়েক মুহূর্ত তারা বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আইয়ুবিদের এবং রক্ষীদের অসম সংগ্রামের দিকে। সম্বিত ফিরে আসার সাথে সাথে একজন এগিয়ে এসে প্রহরীদের আঘাত করে। অন্য রক্ষীরাও ঝাঁপিয়ে পড়ে। এবার রক্ষীরা দুই দলে বিভক্ত হয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি শুরু করল। সালাহউদ্দিন আইয়ুবী তাদের মধ্যে পার্থক্য করতে না পেরে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। সংঘর্ষ থামল। এ সংঘর্ষে দুইজন নিহত হয়। কেউ আহত হন, কেউ পালিয়ে যান। তদন্তে জানা যায়, দেহরক্ষীদের মধ্যে সাতজন ঘাতক দলের সদস্য। খলিফা সালেহের গুমাস্তগিন নামক একজন প্রধান তাদের সুলতান সালাউদ্দিনকে হত্যার জন্য নিযুক্ত করেছিলেন।

2-1

সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে হত্যার এ ধরনের বেশ কয়েকটি প্রচেষ্টা পরপর ব্যর্থ হয়। এই হত্যা পরিকল্পনার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন সাইফুদ্দিন। সাইফুদ্দিন ছিলেন সালাহউদ্দিনের চাচাতো ভাই খলিফা আস সালেহ-এর একজন আমির। আমি যে সময়টির কথা বলছি, মুসলিম বিশ্বের প্রধান হওয়া সত্ত্বেও ইসলামি বিশ্ব কার্যত তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নররা সুলতান উপাধি ধারণ করতেন, তাই বলতে গেলে স্বাধীনভাবে প্রশাসন পরিচালনা করতেন। এই ঘটনার পর একদিন সকালে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি সাইফুদ্দিনকে একটি চিঠি পাঠান। এতে তিনি লিখেছেন, “খাঁচায় বন্দী পাখির মাঝে তুমি চিত্তপ্রসাদ খোঁজ, নারী আর মদের মাঝে খোঁজ জীবনের মানে, কিন্তু জাননা সৈনিকের জীবন মানেই এক বিপজ্জনক খেলা।’

প্রশ্নঃ মহিলাদের বোরকার ধরণ কী রূপ হওয়া ইসলামে নির্দেশ আছে জানতে চাই?

তিনি ১১৭৫ সালের এপ্রিল মাসে চিঠিটি লিখেছিলেন। খলিফা সালেহ এবং সাইফুদ্দিন খ্রিস্টানদের সহায়তায় আইয়ুবির সাথে যুদ্ধ করেছিলেন। পরাজিত হয়ে সাইফুদ্দিন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যান। তার তাঁবুতে পাওয়া গেল অগণিত ধন। খাঁচায় রঙিন পাখি পাওয়া গেছে, এক ঝাঁক সুন্দরী তরুণী, নর্তকী, গায়ক। বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্র এবং পিপা ভর্তি মদ।

খাঁচার দরজা খুলে দিল সালাহউদ্দিন, পাখিরা উড়ে গেল খোলা আকাশে। নৃত্যশিল্পী, গায়ক ও তরুণীদের মুক্তি দেওয়া হয়। আমির সাইফুদ্দিনকে একটি চিঠি লিখেছিলেন, “আপনি অসৎভাবে খ্রিস্টানদের সহায়তায় আমাকে নিশ্চিহ্ন করতে চান।” আপনি কি কখনও ভেবে দেখেছেন যে আপনার এই ষড়যন্ত্র ইসলামী বিশ্বের মানচিত্র মুছে ফেলতে পারে? আপনার যদি আমার প্রতি হিংসা হয়, আমি যদি আপনার শত্রু হই তবে আমাকে হত্যা কর। তিনি দুবার চেষ্টা করেছিলেন। সফল না হলে আবার চেষ্টা করুন। চেষ্টা করুন সফল হবেন ।

আপনি যদি গ্যারান্টি দিতে পারেন যে আমাকে হত্যা করা গেলে ইসলামকে মহিমান্বিত করবে, আমি আমার মাথা কেটে আপনার পায়ের কাছে রাখব। মনে রাখবেন, একজন অমুসলিম কখনই একজন মুসলমানের বন্ধু হতে পারে না। ইতিহাস সাক্ষী। আপনি ফ্রান্সের সম্রাট এবং রিমান্ডের সাথে বন্ধুত্ব করছেন কারণ আপনি খ্রিস্টানদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহায়তা করেন। তারা সফল হলে, আপনি তাদের প্রথম শিকার হতে হবে. তাহলে পৃথিবী থেকে ইসলামের নাম মুছে যাবে।

তোমরা বীর জাতির সন্তান। একজন সৈনিক হওয়া তোমাদের জাতীয় পেশা। প্রত্যেক মুসলমান আল্লাহর সৈনিক। এর একমাত্র শর্ত ঈমান ও নেক আমল। তুমি খাঁচায় বন্দী পাখির কাছে আনন্দ চাও, নারী আর মদ জীবনের অর্থ, কিন্তু সৈনিকের জীবন একটি বিপজ্জনক খেলা। আমার কাজে সহযোগিতা করুন. জিহাদে যোগ দিন, না পারলে অন্তত বিরোধিতা করবেন না। আমি আপনাকে শাস্তি দেব না। আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন।

-সালাহউদ্দীন আইয়ুরী।


এই সমস্ত যুদ্ধের ফলস্বরূপ, অনেক যুদ্ধথেকে প্রাপ্ত ধন সালাউদ্দিন আইয়ুবিদের হাতে আসে। বন্দীর সংখ্যা ছিল অগণিত। তিনি যুদ্ধের মালামাল তিনটি ভাগে ভাগ করেন। যুদ্ধবন্দীদের একটি অংশ দিয়ে তিনি তাদের মুক্ত করেন। তিনি সৈন্য ও গরীবদের এক ভাগ দিয়েছিলেন। তিনি তৃতীয় ভাগটি নিজমুল মুলক বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠান। এখানেই তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি নিজের এবং জেনারেলদের জন্য কিছুই রাখেননি। বন্দীদের অধিকাংশই ছিল মুসলমান। কিছু অমুসলিমও ছিল, যারা আইয়ুবের মহানুভবতা মেনে নিয়ে তার সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল।

ইবনে সাবার ফেদায়ি গোষ্ঠী সালাউদ্দীনকে হত্যা করার জন্য দুবার আক্রমণ করেছিল। ঐতিহাসিকরা ফেদায়ীদেরকে ঘাতক দল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। দুবার আইয়ুবী অল্পের জন্য বেচেঁ যায়। তৃতীয় আক্রমণটি ছিল খ্রিস্টান ও সাইফুদ্দিনের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করার পর। সাইফুদ্দিন পালিয়ে গিয়ে ঘাতকদের সাহায্য চান।

সূরা নাস (Al-Nas) বাংলা অর্থ,উচ্চারণ,শানে নুযুল সহ

সালাউদ্দিনের প্রায় একশ বছর আগে হাসান ইবনে সাব্বাহ ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি নতুন সম্প্রদায়ের জন্ম দেন। তারা নিজেদের মুসলমান বলে পরিচয় দেয়। কিছু অলৌকিক ঘটনা দেখিয়ে অনুসারী তৈরি করতেন। সুন্দরী যুবতী, মদ, সম্মোহন আর চাটুকারিতা ছিল তাদের পুঁজি। বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ঘাতক ছিল। তারা গোপনে মানুষ হত্যা করত।


তারা ছিল সতর্ক, বুদ্ধিমান এবং সাহসী। তারা তাদের পোশাক ও ভাষা পরিবর্তন করে মেজর জেনারেলদের দেহরক্ষী হিসেবে চাকরি নেয়। এতসব হত্যাকাণ্ডের পরও নিহতের হত্যাকারীকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ধীরে ধীরে ইবনে সাবার দলটি ঘাতকের দল হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তারা রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে দক্ষ ছিল, বেশিরভাগই বিষ ব্যবহার করত। সুন্দরী যুবতীরা মদের সঙ্গে এই বিষ মেশাতেন।

সুন্দরী নারী বা মদ দিয়ে সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে হত্যা করা সম্ভব ছিল না। তিনি সাবধানে উভয় থেকে নিজেকে রক্ষা করেছেন। ফলে হঠাৎ অ্যাটাক করা ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না। কিন্তু তাও অনুগত এবং নিবেদিতপ্রাণ দেহরক্ষীদের উপস্থিতিতে অসম্ভব ছিল। সালাহউদ্দিন ভেবেছিলেন সালেহ ও সাইফুদ্দিন পরাজয়ের পর উঠে দাঁড়াবেন না। সম্মিলিত বাহিনীর ঔদ্ধত্য চূর্ণ হওয়ার পর আইয়ুবিদের সাথে সংঘর্ষের সম্ভাবনার প্রতিকার হবে। কিন্তু প্রতিশোধ নিতে তারা নতুন ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়ে।

বিজয়ের পর সালাহউদ্দিন আইয়ুবী তার প্রচারণা চালিয়ে যান। গাজাসহ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল করেন। সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী – একজন সাহসী যোদ্ধা, একজন মহান সেনাপতি। ইসলামের শত্রুরা এখনও তাকে ‘দ্য গ্রেট সালাদিন’ বলে ডাকলেও মুসলিমরা তাকে জাতীয় বীর হিসেবে স্মরণ করে। মুসলিম জাতির ইতিহাসের পাতায় তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। খ্রিস্টধর্ম তার সাহস, বুদ্ধিমত্তা এবং যুদ্ধের দক্ষতা কখনই ভুলবে না। তার বিজয়-পরাজয়ের বিস্ময়কর কাহিনী ইতিহাসের পাতায় ছড়িয়ে আছে। কিন্তু ক্রুশের পতাকাধারীরা মদ ও চেহারার মায়ায় যে ষড়যন্ত্র ছড়িয়েছিল, তাদের অপকর্মের চমকপ্রদ কাহিনী ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলতে অনেক চেষ্টা করেছে তারপরও পারেনি যেভাবে তারা সুলতান আব্দুল হামিদকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল।


১১৬৯ সালের ২৩ মার্চ। মিসরের গভর্ণর এবং সেনাবাহিনী প্রধান হয়ে এলেন সালাহউদ্দীন। তিনি ছিলেন রাজ পরিবারের সন্তান। অল্প বয়সেই যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি মনে করতেন শাসক রাজা নয়, শাসক হলো ইসলামের রক্ষক। বুদ্ধি হওয়ার পর তিনি দেখেছিলেন মুসলিম শাসকদের অনৈক্য। বিলাসপ্রিয় শাসকবর্গ সুন্দরী রমণী আর মদে আকণ্ঠ ডুবেছিল। গাদ্দারী, বিলাসিতা আর অবিশ্বাসের কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে উঠেছিল মুসলিম মিল্লাতের ভবিষ্যত। রাষ্ট্রের কর্ণধারদের হারেমের শোভা বর্ধন করছিল ইহুদী আর খৃস্টান যুবতীরা। বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এসব সুন্দরী রমনীদের রূপের আগুনে পুড়ে ছাই হচ্ছিল মানুষের ইসলামী জোশ আর স্বতন্ত্র জাতিসত্ত্বার আবেগ অনুভূতি।

Best : আল্লাহ পিক | আল্লাহ পিকচার | আল্লাহর নামের পিকচার ডাউনলোড

এই সুযোগে খ্রিস্টান শাসকরা একের পর এক ছোট ছোট মুসলিম রাষ্ট্র দখল করে নিচ্ছিল। মুসলিম শাসকরা তাদের প্রজাদের রক্তচুষে খ্রিস্টানদের বার্ষিক কর প্রদান করেছিল। মুসলিম বাহিনীরা সর্বদা তাদের শক্তির ভয়ে ছিল। খ্রিস্টানরা মুসলমানদের বিলাসিতায় বন্দী করে সমগ্র মুসলিম বিশ্ব জয় করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছিল। সালাহউদ্দিন নিজাম-উল-মুলক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা লাভ করেন। এখানে ছাত্রদের খালেশ ইসলামী আদর্শে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আর সে কারণেই ঘাতকদের প্রথম শিকার হন নিজাম-উল-মুলক। তিনি রোমান সম্প্রসারণের একটি প্রধান বাধা ছিলেন। এই বাধা দূর করতে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

১১৬৯ সালের ২৩ মার্চ। মিসরের গভর্ণর এবং সেনাবাহিনী প্রধান হয়ে এলেন সালাহউদ্দীন।
১১৬৯ সালের ২৩ মার্চ। মিসরের গভর্ণর এবং সেনাবাহিনী প্রধান হয়ে এলেন সালাহউদ্দীন।

সালাহউদ্দিন এখানে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। নুরুদ্দিন জঙ্গী তাকে প্রশাসনিক কাজে প্রশিক্ষণ দেন। এখানে তিনি মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের সকল গুণাবলী অর্জন করেন। সালাহউদ্দিন আইয়ুবী গোয়েন্দা স্টাডিজ, কমান্ডো অপারেশন এবং গেরিলা অপারেশনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন। তিনি দেখলেন খ্রিস্টানরা গুপ্তচরবৃত্তিতে অনেক এগিয়ে। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল মুসলিম চিন্তা ও সংস্কৃতিকে নষ্ট করা। সালাহউদ্দিন অত্যন্ত ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার সাথে তা মোকাবেলা করেন। তিনি মিশরের গভর্নর ও সেনাবাহিনীর প্রধান হলে শুরু হয় ষড়যন্ত্র। বড় জেনারেলরা এই পদের জন্য লোভনীয় ছিলেন। তাদের আশা ভঙ্গ হতে দেখে ক্ষুব্ধ জেনারেলরা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে।

তাদের মতে, সালাহউদ্দিন একজন বখাটে। তিনি এই পদের জন্য যোগ্য নন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই জেনারেলদের ধারণা ভেঙ্গে যায়। সালাহউদ্দিন কঠোর নিয়ম মেনে চলতেন। সৈন্যদের জন্য বিলাসিতা এবং অ্যালকোহল নিষিদ্ধ করলেন। তাদের শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক শক্তি বাড়ানোর দিকে মনোনিবেশ করেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে সেনাবাহিনী সুশৃঙ্খল ও সংগঠিত হয়ে ওঠে। তরুণ দাড়িওয়ালা ছেলেটি তাদের দিকে মাথা নাড়ল যারা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো।

সালাদিন খ্রিস্টান বাহিনীর মোকাবেলায় একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনীর প্রয়োজন অনুভব করেন। স্বাধীন ফিলিস্তিনে প্রাণ ভরানোর প্রবল আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তিনি এভাবে সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে শুরু করেন। তিনি ঘোষণা করলেন, ‘যে আল্লাহ আমাকে মিশরের গভর্নর বানিয়েছেন, তিনি অবশ্যই ফিলিস্তিনকেও মুক্ত করবেন।’ এই ঘোষণার জন্য শুধু খ্রিস্টানরাই নয়, খ্রিস্টানপন্থী মুসলিম আমীররাও তার শত্রু হয়ে ওঠে। ভিতরের শত্রুরা তার কাছে বাইরের শত্রুদের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।


নতুন গভর্নরের অভ্যর্থনার আয়োজন করা হল। আয়োজন করলেন জেনারেল নাজি। পঞ্চাশ হাজার ফৌজের অধিনায়ক তিনি। অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী ছাড়াও বেসামরিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত। মুচকি হেসে একে একে সকলের সাথে করমর্দন করলেন সালাহউদ্দীন আইয়ুবী। কণ্ঠে স্নেহ-ভালবাসার উষ্ণ পরশ। কোন কোন অফিসারের ঠোঁটে কুটিল হাসি। দৃষ্টিতে ঘৃণা আর উপহাস। ওদের ধারনা, নুরুদ্দীন জংগীর সাথে সুসম্পর্ক এবং রাজপরিবারেির সন্তান বলেই সালাহউদ্দীন গভর্নর হতে পেরেছেন। এক প্রবীণ অফিসার আরেকজনের কানে কানে বলল, ‘এখনো শিশু, আমরা পেলে পুষে নেব।’

অনুষ্ঠানে তাকে শিশুই মনে হচ্ছিল। জেনারেল নাজির সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন আইয়ুবী। কপাল কুঞ্চিত হল ঈষৎ। করমর্দনের জন্য হাত প্রসারিত করলেন। নাজি তোষামুদে দরবারীদের মত সালাহউদ্দীনকে কুর্নিশ করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। কপালে চুমো খেয়ে বললেন, ‘আপনার জীবন রক্ষার্থে আমার দেহের শেষ রক্তবিন্দুটুকুও বিলিয়ে দেব। আপনি আমাদের কাছে মাননীয় জংগীর আমানত।’ ‘ইসলামের চাইতে আমার জীবনের দাম বেশী নয় সম্মানিত জেনারেল।’ আইয়ুবী বললেন, ‘প্রতিটি ফোঁটা রক্ত সংরক্ষণ করে রাখুন। খৃষ্টান ষড়যন্ত্রের ঘনঘটা মুসলিম বিশ্বের আকাশে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।’

জবাবে নাজি মৃদু হাসল। যেন তাকে রূপকথার গল্প বলা হচ্ছে। নাজিরা ছিল ফাতেমীয় খিলাফতের সদস্য। পঞ্চাশ হাজার সৈন্যের সেনাপতি। সৈন্যরা সবাই সুদানী। তার সেনাবাহিনী আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত ছিল। অন্য কথায়, তারা ছিল নাজির ব্যক্তিগত সৈন্য। নাজিরা ছিল মুকুটবিহীন সম্রাট। তখন মুসলিম দেশগুলোর কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল না। তারা একে অপরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করত। খ্রিস্টানরা এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করছিল। নাৎসিরা মিশর এবং এর আশেপাশের শাসকদের কাছে একটি ত্রাস ছিল। তার মস্তিষ্ক ছিল ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু। ভেড়া দেখলে যেমন নেকড়ের দাঁত বের হয়, তেমনি সালাহউদ্দিনকে দেখলে নাজিরের দাঁত বেরিয়ে আসে। আইয়ুবী তার এইধরনের হাসির অর্থ বুঝতে পারেননি, তবে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তার এই শক্তিশালী জেনারেলের প্রয়োজন। দূর থেকে হুজুর এসেছেন। কিছু বিশ্রাম করে নিন । ‘ নাজি বলল, আমাকে যে কঠিন কাজটি দেওয়া হয়েছে আমি তার যোগ্য নই। এই দায়িত্ব আমার বিশ্রাম ও ঘুম কেড়ে নিয়েছে। আগে অফিসে যাওয়া কি ভাল হতো না?’

সূরা কাওসার – বাংলা অর্থ উচ্চারণ ও ফযিলত। Surah Al-Kauthar

“স্যার, আপনি কি আগে খেতে চান?” একজন কর্মকর্তা জিজ্ঞেস করলেন । সালাউদ্দিন আইয়ুবী কিছুক্ষণ চিন্তা করে তাদের সাথে হাঁটতে লাগলেন। সশস্ত্র রক্ষীরা দুই সারিতে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের বাহু এবং পেশীবহুল শক্তিশালী দেহ দেখে তার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। দরজার কাছে পৌঁছতেই হঠাৎ তার মুখের আলো নিভে গেল। বরং হতাশার অন্ধকার তাকে গ্রাস করেছে। দরজার সামনে চার সুন্দরী তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। সিল্কি নরম চুল তাদের পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে আছে। পাতলা কাপড় পরা । হাতে ফুলের ঝুড়ি। তারা সালাহউদ্দিনের পথে ফুল ছুড়তে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে করতাল ও বীণার আওয়াজ বেজে উঠল। আইয়ুবী থামলেন। বাম এবং ডানে নাজি এবং তাদের বন্ধুরা। ভারতীয় রাজকুমারদের মতো, তারা তাকে সম্মান করেছিল এবং তাকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিল।

সালাহউদ্দিন ফুল মাড়াতে আসেননি। আইয়ুবীর কন্ঠ বেজে উঠল। ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি। সেই হাসি দেখতে তারা অভ্যস্ত নয়। “প্রভু যদি চান, আমরা আকাশের তারা আনতে পারি,” নাজি বলল। সালাহউদ্দিন মৃদু হেসে বললেন, “আমাকে খুশি করার জন্য একটা জিনিসই ছুড়ে দেওয়া যায়। খ্রিস্টানদের মৃতদেহ”। অফিসারের হাসি ম্লান হয়ে গেল। সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর চেহারা মুহূর্তেই বদলে গেল। দুই কোণ থেকে আগুনের আলো বের হতে লাগল। তিনি বলেন, মুসলমানদের জীবন ফুলের বিছানা নয়। তুমি কি জানো না যে খ্রিস্টানরা মুসলিম বিশ্বকে ইঁদুরের মতো কাটছে?’

"স্যার, আপনি কি আগে খেতে চান?" একজন কর্মকর্তা জিজ্ঞেস করলেন । সালাউদ্দিন আইয়ুবী কিছুক্ষণ চিন্তা করে
“স্যার, আপনি কি আগে খেতে চান?” একজন কর্মকর্তা জিজ্ঞেস করলেন । সালাউদ্দিন আইয়ুবী কিছুক্ষণ চিন্তা করে

তার গম্ভীর কণ্ঠে ঘরের পরিবেশ বদলে গেল। প্রতিটা কথায় রাগ ঝরে পড়ল। “আজ আমরা ফুলকে পদদলিত করেছি কারণ আমরা তাদের উন্মুক্ত করে আমাদের মেয়েদের সম্মান পদদলিত করেছি। শোন, আমার চোখ ফিলিস্তিনের দিকে স্থির। তুমি কি আমার পথে ফুল নিক্ষেপ করে ইসলামকে মিশর থেকে দূরে পাঠাতে চাও? আমি যদি পা বাড়াই এই ফুলে, আমার হৃদয় কাঁটাযুক্ত হবে।” মেয়েদের সরান, আমি চাই না আমার তলোয়ার তাদের সোনালি চুলে আটকে গিয়ে আমার তরবারির গতি হারাক।

হযুরকে সম্মান করুন। . . . .. ‘আমাকে আর কখনো হুজুর বলবেন না।’ রাগের স্বরে বলল। যেন শব্দের জোরে তাদের শরীর থেকে মাথা ছিঁড়ে গেছে। তিনি সেই প্রভু যার কালেমা তোমরা পড়েছ। আমি কেবল তার বান্দা। সেই হুজুরের জন্য জীবন দিতে চাই। তার উত্তরাধিকার আমি আমার বুকে লুকিয়ে রেখেছি। খ্রিস্টানরা সেই বার্তা কেড়ে নিয়ে রোম উপসাগরে ডুবিয়ে দিতে চায়। আমায় মদের নদীতে ডুবিয়ে দিতে চাই। আমি এখানে রাজা হতে আসিনি।’ নাজিরের চোখের ইশারায় মেয়েরা ফুল কুড়িয়ে দরজার বাইরে চলে গেল। সালাদীন দ্রুত প্রবেশ করল। প্রশস্ত কক্ষ ফুল দিয়ে সজ্জিত বিশাল টেবিল। টেবিলে বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু খাবার। ‘

খাবারের দিকে তাকিয়ে সালারের দিকে তাকাল সহকারী। ‘মিশরের সব মানুষ কি এমন খাবার খেতে পারে?’ ‘না জনাব’. সহকারী জবাব দিল, “গরীব মানুষ এই খাবার স্বপ্নেও দেখে না।” “আপনি কোন সমাজের লোক?” যারা এই ধরনের খাবারের স্বপ্নও দেখেন না তারা কি আপনার চেয়ে ভিন্ন জাতি?’ সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। ‘ডিউটিতে থাকা সব চাকর-সিপাহীকে এখানে ডেকে নিন। তারা এই খাবার খাবে।

সালাহউদ্দিন আইয়ুবী এক টুকরো তরকারিসহ রুটির টুকরো তুলে নিয়ে দ্রুত খাওয়া শেষ করলেন। তারপর নাজিকে সঙ্গে নিয়ে গভর্নর হাউসের দিকে হাঁটা দিলেন। দুই ঘণ্টা পর নাজি গভর্নর হাউস থেকে বেরিয়ে এল। সে দ্রুত ঘোড়ার দিকে এগিয়ে গেল। লাফ দিয়ে ঘোড়াটি দৃশ্য থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। রাত নেমে এসেছে। নাজি খাস কামরায় কয়েকজন বিশ্বস্ত বন্ধুর সাথে একটি মদ্যপানের পার্টি করে। নাজি বললেন, ‘কয়েকদিনের মধ্যেই যৌবনের আভা শীতল করব। কামবখত কি বললেন জানেন? তিনি বললেন, কাবার প্রতিপালকের শপথ! আমি তখনই বিশ্রাম নেব যখন মুসলমানরা খ্রিস্টানদের পৃথিবী থেকে তাড়িয়ে দেবে।’


‘সালাহউদ্দীন আইয়ুবী? হুহ্!’ সহকারী সালারের কণ্ঠে তাচ্ছিল্যের সুর। ‘ইসলামী রাষ্ট্রের দম ফুরিয়ে গেছে সে এর খবরও জানেনা। এখনতো সুদানীরা দেশ চালাবে।’ অন্য এক কমাণ্ডার প্রশ্ন করল, ‘পঞ্চাশ হাজার ফৌজের সবাই সুদানী একথা তাকে বলেননি। বলেননি যে ওরা আপনার নির্দেশে খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না?’ ‘তোমার কি মাথা খারাপ এডরোস? আমি বরং তাকে নিশ্চয়তা দিয়েছি। বলেছি আপনার ইশারা পেলেই আমরা সৈন্যরা খৃষ্টানদের ছিড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। কিন্তু. . .’ থেমে গেল নাজি। ‘কিন্তু কি?’

‘মিসরের লোকদেরকে ফৌজে ভর্তি করার জন্য সে আমাকে নির্দেশ দিয়েছে। কারণ ফৌজ এক এলাকার থাকা নাকি উচিৎ নয়। সে মিসরের লোকদেরকে আমার সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে।’ ‘আপনি কি বললেন?’ ‘বলেছি আপনার নির্দেশ পালন করা হবে। কিন্তু আমি তা করব না।’ ‘তার মনমানসিকতা কেমন বুঝলেন?’

‘একরোখা জেদী।’ ‘আপনার বুদ্ধি আর অভিজ্ঞতার সামনে সে এখনো শিশু। নতুন গভর্নর হয়ে এলো তো! কদিন পরই পদের নেশায় পেয়ে বসবে।’ ‘আমি তার এ নেশা দূর করবো না। নেশায় নেশায় তাকে নিঃশেষ করব।’ ওরা অনেকক্ষণ ধরে আইয়ুবীকে নিয়ে কথা বলল। নতুন গভর্নর এই মুকুটহীন সম্রাটের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ালে কি পদক্ষেপ নেয় হবে তাও আলোচিত হল।

অন্যদিকে আইয়ুবী তার সহকারীদের বলছিলেন, ‘আমি এখানে রাজা হয়ে আসিনি। কাউকে রাজত্ব করতেও দেবো না।’ তিনি আরো বললেন, ‘আমাদের সামরিক শক্তির প্রয়োজন। এখানকার সেনাবাহিনীর গঠন পদ্ধতি আমার পছন্দ নয়। পঞ্চাশ হাজর ফৌজের সবাই সুদানী। অথচ সব এলাকার লোকেরই সৈন্য হবার অধিকার আছে। এভাবে ওদের জীবনের মানও উন্নত হতে পারে। সব এলাকা থেকে সেনাবাহিনীতে লোক ভর্তি করার জন্য আমি নাজিকে বলে দিয়েছি।

‘নাজি কি আপনার নির্দেশ পালন করবে?’ একজন সহকারী প্রশ্ন করল। ‘কেন, সে কি আমার হুকুম অমান্য করবে নাকি?’‘করতেও পারে। ফৌজের সর্বময় কর্তা তিনি। তিনি কারো নির্দেশ পালন করেন না, বরং অন্যকে তার নির্দেশ পালনে বাধ্য করেন।’ এ কথায় সালাহউদ্দীন একটু নীরব রইলেন। তবে তার চেহারায় কোন ভাবান্তর দেখা গেল না। তিনি কি ভাবছেন তা বুঝে উঠার আগেই আলী বিন সুফিয়ানকে রেখে অন্যদের বিদায় জানালেন তিনি।

আলী মধ্য বয়সী এক চৌকস গোয়েন্দা লিডার। কুশলী, সাহসী এবং অসম্ভব বাকপটু। গুপ্তচর বৃত্তির জন্য সে বিশ্বস্ত ও নিবেদিতপ্রাণ কিছু লোককে ট্রেনিং দিয়ে পারদর্শী করে তুলেছে। তাদের নিয়ে গড়ে তুলেছে নিজস্ব গোয়েন্দা দল। আকাশ থেকে তারকা ছিনিয়ে আনতে বললেও যারা পিছপা হবে না। চিন্তা চেতনার দিক থেকে সে ছিল আইয়ুবীর সমমনা। সালাউদ্দীন তাকে বাগদাদ থেকে সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন।

‘শুনলাম তো। চিনতে ভুল না করলে বলব, লোকটি ধুরন্ধর ও বড় ধরনের ক্রিমিনাল। তার ব্যাপারে আগে থেকেও আমি কিছুটা জানি। জনগণের টাকায় লালিত সেনাবাহিনী এখন তার নিজস্ব ফৌজ। তার ষড়যন্ত্রের ফলে প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। ‘সব এলাকার লোকই সেনাবাহিনীতে ভর্তি করার প্রয়োজন’ আপনার এ সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী এবং সঠিক হয়েছে। আমার তো আশংকা হচ্ছে সুদানী সৈন্যরা প্রয়োজনের সময় আপনার হুকুম অমান্য করে তারই অনুগত্য করবে। বলা যায়না, ফৌজের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি পরিবর্তন করে নাজিকে আনপার অপসারণও করতে হতে পারে।

‘না, নাজির মত প্রভাবশালী ব্যক্তিকে এখনই বিরূপ করতে চাই না। এ মুহূর্তে তাকে অপসারণ করা ঠিক হবে না। নিজেদের রক্ত ঝরানোর জন্য আমি অস্ত্র হাতে নেইনি, আমাদের তরবারী শত্রুর জন্য। আমি আগে ভালবাসা দিয়ে তাকে পরিবর্তন করতে চেষ্টা করব। তুমি বর্তমান সেনাবাহিনী আমাদের কদ্দুর কাজে আসবে তা-ই বোঝার চেষ্টা কর।’

‘আপনার ভালবাসা তাকে শুধরাতে পারবে বলৈ মনে হয় না’। সালাহউদ্দীন যা ভেবেছিলেন নাজি ততোটা সহজ ছিল না। ভালবাসা শব্দটি তার অভিধানে ছিল না। তার সব প্রীতি এবং মমতা ছিল ক্ষমতার সাথে। ক্ষমতার প্রশ্নে সে ছিল অত্যন্ত কঠোর। মানুষ হিসাবে ছিল অসম্ভব ধূর্ত। ষড়যন্ত্র ছিল তার হাতিয়ার। কাউকে ফাঁসাতে চাইলে তার সাথে মোমের মত কোমল ব্যবহার করত। আইয়ুবীর সাথ তার ব্যবহার ছিল অনুগত দাসানুদাসের মত। তার সামনে সে কখনো বসত না। আইয়ুবীর প্রতিটি কথায় জি-হুজুরীর ভূমিকা পালন করত।

নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে সে মিসরের সকল অঞ্চল থেকেই সেনা ভর্তি শুরু করে দিয়েছিল। সময় এগিয়ে যাচ্ছে। আইয়ুবীও তাকে একটু একটু পসন্দ করা শুরু করেছেন। নাজি তাকে আশ্বাস দিয়েছিল, সেনাবাহিনী আপনার নির্দেশের অপেক্ষায়। ফৌজের পক্ষ থেকে নতুন গভর্নরকে ‘গার্ড অব অনার’ দেয়ার প্রস্তাবও দিল সে। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে তিনি তার এ আমন্ত্রণ মুলতবী রাখলেন।

রাত নেমেছে। নিজের কক্ষে দু’জন কমাণ্ডার নিয়ে মদ পান করছিল নাজি। মৃদু লয়ে বাজছে সংগীতের সুর মুর্ছনা। তালে তালে নাচছে দু’জন নর্তকী। পায়ে নুপুর নেই। বে আব্রু দেহের ভাঁজে ভাঁজে মাদকতা। প্রহরী ভেতরে এসে নাজির কানে কানে কি যেন বলল।

মদির আবেশে মত্ত নাজির আনন্দে বিঘ্ন ঘটাবার সাহস কারো ছিল না। কিন্তু এ আসর থেকে তাকে কোন্ সময় তুলে নেয়া যায়’ প্রহরী তা জানত। উঠে দাঁড়ালেন নাজি। প্রহরী তাকে একটি কক্ষে নিয়ে গেল। সুদানী পোশাক পরে একজন লোক বসে আছে। সাথে এক যুবতী। নাজিকে দেখে দু’জন উঠে দাঁড়াল। যুবতীর রূপ মাধুর্য দেখে নাজি খানিক হতভম্বের মত তাকিয়ে রইল। সে নারী শিকারী। শুধু ভোগের জন্যই নয়, বড় বড় অফিসারদের ব্লাকমেল অথবা তাদেরকে হাতে রাখার জন্যও সুন্দরী যুবতীদের ব্যবহার করত নাজি। কসাই যেমন পশু দেখলে গোশত পরিমাণ করতে পারে, সেও প্রথম দেখাতেই বুঝত কাকে দিয়ে কোন কাজ করানো যাবে। নারী ব্যবসায়ীরা প্রায়শই তার কাছে মেয়ে নিয়ে আসত।

বিক্রেতা যুবতীর ব্যাপারে বলল, ‘দারুণ স্মার্ট। নাচতে পারে, গাইতে পারে, মুখের মধুতে পাথরও গলিয়ে দিতে পারে।’ নাজি ওর ইন্টারভিউ নিয়ে চমৎকৃত হল। ভাবল, একটু তৈরী করে নিলে যে কোন কাজেই ব্যবহার করা যাবে। দাম দস্তুর শেষে টাকা নিয়ে চলে গেল লোকটি। নাজি ওকে নিয়ে চলে এল জলসা ঘরে। নাচতে বলল তরুলীকে। দেহের বাড়তি কাপড় ফেলে দিয়ে দু’পাক ঘুরতেই হা হয়ে গেল তিন দর্শক। ফ্যাকাশে হয়ে গেল আগের দু’নর্তকীর চেহারা। নতুন মেয়েটার সামনে ওরা এখন মূল্যহীন বাসি ফুল।

আসর ভেঙে দিল নাজি। নতুন মেয়েটাকে রেখে সকলকে বিদায় করে দিল। ‘নাম কি সুন্দরী?’ ‘আমার নাম জুলি’। ‘তোমাকে যে দিয়ৈ গেল সে বলেছে, তুমি নাকি পাথর গলাতে পার। আমি তোমার সে যোগ্যতা যাচাই করতে চাই। ‘ ‘কে সে পাথর?’ ‘মিসরের নতুন গভর্নর। যিনি একই সাথে সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়কও।’ ‘সালাহউদ্দীন আইয়ুবী?’ ‘হ্যাঁ, যদি তাকে বশে আনতে পার তবে তার ওজন সমান সোনা তোমার পুরস্কার।’ ‘তিনি কি মদ পান করেন?’ ‘না, মুসলমান শূকরকে যেমন ঘৃণা করে, সে মদ, নারী, নাচ, গান এবং ভোগবিলামকে তেমনি ঘৃণা করে।’

‘শুনেছি আপনার কাছে এমন সব যুবতী রয়েছে যাদের দেহের যাদু নীল নদের স্রোতকেও রুদ্ধ করে দিতে পারে। ওরা কি ব্যর্থ?’ ‘এখনো পরীক্ষা করে দেখিনি। আমার বিশ্বাস তুমি এ কাজ করতে পারবে। সালাহউদ্দীনের বিশ্বাস এবং চরিত্র সম্পর্কে আমি তোমাকে বিস্তারিত বলবো।’ ‘তাকে কি বিষ খাওয়াতে হবে?’ ‘এখন নয়। তার সাথে আমার কোন শত্রুতা নেই। আমি চাই সে তোমার মত রূপসীর আঁচলে বাঁধা পড়ুক। এরপর তাকে আমার পাশে বসিয়ে মদ খাওয়াব। মারতে চাইলে তোমার প্রয়োজন নেই, ঘাতক দলকে দিয়ে সহজেই তা করানো যায়।’

‘তার মানে আপনি দুশমনি নয় বন্ধুত্ব চাইছেন?’ জুলির বুদ্ধিমত্তায় নাজি কতক্ষণ হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ‘হ্যাঁ জুলি।’ ওর রেশম কোমল চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল নাজি, ‘আমি তার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই। এমন বন্ধুত্ব, যেন সে আমার কথায় উঠে এবং বসে। এর পর কি করতে হবে তা আমি জানি।’ থামল নাজি। একটু ভেবে নিয়ে আবার বলল, ‘একটা কথা তোমাকে বলা প্রয়োজন। সালাহউদ্দীনের হাতেও একটা চাল আছে। তোমার রূপ যৌবনের ওপর তার চাল বিজয়ী হলে তুমি বাঁচতে পারবে না। সালাহউদ্দীনও তোমায় বাঁচাতে পারবে না। তোমার জীবন আমার হাতে। এ জন্যই তোমার সাথে এত খোলামেলা কথা বলছি। নইলে আমার মত জেনারেল তোমার মত এক গনিকার সাথে এভাবে আলাপ করত না।’

‘অনাগত ভবিষ্যত বলে দেবে কে ধোঁকা দেয়। এবার বলুন তার কাছে আমি পৌঁছব কিভাবে?’ ‘আমি তার সম্মানে এক সংবর্ধনার আয়োজন করতে যাচ্ছি। রাতে তার শয়ন কক্ষে তোমায় ঢুকিয়ে দেব।’ ‘ঠিক আছে, এর পরের কাজ হবে আমার। সে রাতের পর আরও ক’টা রাত চলে গেছে। প্রশাসনিক কাজ এবং নতুন সৈন্য ভর্তি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় আইয়ুবী নাজির নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারেননি। এর মধ্যেই নাজি সম্পর্কে আলী বিন সুফিয়ানের আরো রিপোর্ট পাওয়া গেল। আলীর সে রিপোর্ট পেয়ে সালাহউদ্দীন চিন্তিত হয়ে উঠলেন। ‘আলী! এর অর্থ হল সে খৃষ্টানদের চাইতেও বিপদজনক।’

‘লোকটা মিসরের পোশাকের ভেতর লুকিয়ে থাকা বিষাক্ত সাপ। প্রশাসনের অনেক বড় বড় লোক তার হাতে। সেনাবাহিনীও আমাদের নয় বরং অন্যের অনুগত। এ ব্যপারে কি করা যায় কিছু ভেবেছেন?’ ‘শুধু ভাবিনি, কাজও শুরু করে দিয়েছি। সুদানী সৈন্যদেরকে নতুন সৈন্যদের সাথে একীভূত করে দেব। এখন এরা না হবে সুদানের, না মিসরের। এপর নাজিকে সোজা পথে নিয়ে আসা যাবে।’

‘আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি, সে খৃষ্টানদের সাথে নিজের ভবিষ্যত জুড়ে দিয়েছে। মুসলিম বিশ্বকে এক কেন্দ্রের আওতায় এনে আপনি মুসলিমদের শক্তি বৃদ্ধি করতে চাইছেন। কিন্তু নাজি আপনার ও ইচ্ছেকে পাগলামী মনে করে।’

‘তুমি কি করছ?’ ‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। তার চারপাশে আমি গুপ্তচরের প্রাচীর তৈরী করে দিয়েছি। মনে করুণ সে এখন গোয়োন্দাদের দুর্গে বন্দী। আমি সব বিষয়েই আপনাকে অবহিত করব।’ আলীর ওপর ছিল সালাহউদ্দীনের পূর্ণ আস্থা। তাই তার গোপন তৎপরতা সম্পর্কে কিছুই তাকে জিজ্ঞেস করলেন না। ‘শুনলাম নাজি আপনাকে সম্বর্ধনা দিতে চাইছে। যেতে চাইলে আমি যখন বলব তখন যাবেন।’

সালাহউদ্দীন আইয়ুবী কতক্ষণ ঘরের মধ্যে পায়চারী করলেন। হঠাৎ কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এল ব্যথাভরা ‘আহ’ শব্দ। দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। তাকালেন আলী বিন সুফিয়ানের দিকে। ‘আলী, জীবন মৃত্যু তো আল্লাহর হাতে। উদ্দেশ্যহীন ভাবে বেঁচে থাকার চাইতে জন্মের সাথে সাথেই কি মরে যাওয়া ভাল নয়? কখনো ভাবি, যাদের মাঝে জাতীয় চেতনাবোধ নেই, নেই কোন মহৎ ভাবনা সম্ভবতঃ পৃথিবীতে তারাই সুখী। ওরা নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকে, মরেও যায় তেমনি।

‘না, সম্মানিত আমীর! ওরা সবচে বেশী হতভাগা।’ ‘হ্যাঁ আলী। আমি যখন ওদেরকে ভাগ্যবান মনে করি কে যেন আমার কানের কাছে এসে তোমার কথাটাই উচ্চারণ করে যায়। মনে রেখো আলী, ইতিহাসের বর্তমান ধারা পরিবর্তন করতে না পারলে মুসলিম বিশ্ব হারিয়ে যাবে উপত্যকা আর মরুভূমির সীমাহীন বিস্তারে। খেলাফত এখন তিন ভাগে বিভক্ত। আমীর ওমরার দল স্বেচ্ছাচারী, খৃস্টান ষড়যন্ত্রের আঁধারে হারিয়ে যাচ্ছে ওরা। আমার আশংকা হচ্ছে, মুসলমানরা বেঁচে থাকলেও থাকবে খৃষ্টানদের গোলামীর শৃংখলিত। শুধু বেঁচে থেকেই সন্তুষ্ট থাকবে ওরা। জাতিসত্ত্বা বলে কিছুই থাকবে না, যেন সে শুধু এক মৃতের কফিন। দেখছো না, অর্ধশতাব্দীর মধ্যেই আমাদের মানচিত্র কতো সংকীর্ণ হয়ে এসেছে!’

মাথা নুইয়ে আবার তিনি পায়চারী করতে লাগলেন। কুঞ্চিত কপালে চিন্তার ভাজ। এক সময় মাথা সোজা করে দাঁড়িয়ে গমগম কণ্ঠে বললেন, ‘আলী, নিজের ভেতর থেকে ধ্বংস শুরু হলে তা রোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের খেলাফত এবং আমীরগণ বর্তমান অবস্থায় থাকলে খৃষ্টানদের আক্রমণ করার প্রয়োজনই পড়বে না। যে আগুণ আমাদের ঈমান, আমাদের কর্ম আর জাতিসত্ত্বাকে পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দিচ্ছে খৃস্টানরা তাতে ঘৃতাহুতি দিচ্ছে মাত্র। ওদের ষড়যন্ত্র আমাদেরকে একে অন্যের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে বাধ্য করছে। হয়তো আমার ইচ্ছে অপূর্ণই থেকে যাবে। আমি পরাজিত হতে পারি, তবুও জাতির কাছে আমি কিছু কথা রখে যেতে চাই। আমি চিৎকার করে বলতে চাই, অমুসলিমকে কখনো বিশ্বাস করো না। যুদ্ধ করতে করতে জীবন দেবে, তবু দুশমনের পাতা ফাঁদে পা দেবে না।’

‘মনে হচ্ছে আপনি হতাশ হয়ে গেছেন?’

‘না আলী, নিরাশ হইনি, একটু আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। আলী, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের কাছে আমাদের নির্দেশ পৌঁছে দাও। সেনা ভর্তি আরো তীব্রতর কর। যুদ্ধে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সবসময় প্রাধান্য দেবে। সৈন্য ভর্তির বাধ্যতামূলক শর্ত হল ইসলামী আমল আখলাক। শক্তিশালী গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার দিকে বিশেষ নজর দেবে। ওদেরকে স্পেশাল গেরিলা ট্রেনিং দেবে। শত্রুর এলাকায় গিয়ে কাজ করতে হবে ওদের। ওরা হবে সুইসাইড স্কোয়ার্ড। গেরিলাদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা কর।

ওদের থাকতে হবে উটের মত দীর্ঘসময় ক্ষুঁৎ পিপাসা সহ্য করার শক্তি। দৃষ্টি হবে ঈগলের মত, মরু শিয়ালের মত হবে সতর্ক। চিতাবাঘের মত ওরা ঝাঁপিয়ে পড়বে শত্রুর ওপর। শক্তি সাহস আর বুদ্ধিমত্তায় হবে অনন্য। মদ হাসিস বা এ জাতীয় মাদকাসক্তি থেকে মুক্ত থাকতে হবে ওদের। ওদেরকে মোকাবেলা করতে হবে সেই সব নারীদের যৌবনের পশরা সাজিয়ে, চোখে মদির নেশা জাগিয়ে যারা আসবে ওদের ছোবল হানতে। এ ব্যাপারগুলো এদের এমন ট্রেনিং দেবে, যেনো নৃত্যরত পরী এলেও ওরা থাকতে পারে বরফশীতল।

ভর্তি আরো তীব্রতর করো আলী। মনে রেখো, আমি আবেগতাড়িত হয়ে কাজ করতে পছন্দ করিনা। সংখ্যায় যত নগন্যই হোক, আমি যোদ্ধা চাই। সেই সব যোদ্ধা, যাদের ভেতরে থাকবে ইসলামী ঐতিহ্য ও চেতনাবোধ। কেন যুদ্ধ করছি এ প্রশ্ন কখনো কারো মনে উদয় হবে না। শুরুতকেই সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার উদ্দেশ্য কি তা ওদের ভাল করে বুঝিয়ে দাও। এ দুর্দিনে জাতি তাদের কাছে কতটুকু ত্যাগ ও কোরবানী দাবী করে এ কথা প্রত্যেকটি সৈনিকের অন্তরে এমন ভাবে গেঁথে দাও, যাতে এটাকে কেউ কেবল চাকরী মনে না করে।’

নাজি তার ক্ষমতা ও প্রাধান্য টিকিয়ে রাখার স্বার্থে একটি দুঃসাহসিক গোয়েন্দা সংস্থা গড়ে তুলেছিল। ওরা নাজিকে বলল, ‘আলী বিন সুফিয়ান সালাহউদ্দীন আউয়ুবীর বিশেষ উপদেষ্টা এবং গুপ্তচর বৃত্তিতে আরব শ্রেষ্ঠ। আপনার অস্তিত্বের জন্য সে এক মারাত্মক হুমকী স্বরূপ।’

নাজি আলীর পেছনে সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা লাগিয়ে রেখেছিল। তাদের রিপোর্টের পর সে আলীকে হত্যা করারও পরিকল্পনা করল। সালাহউদ্দীনকে ফাঁসানোর জন্য জুলিকে তৈরী করেছিল নাজি, কিন্তু সে জানতেও পারেনি, নিজেই সে জুলির ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছে। শুধু অসাধারণ রূপের জৌলুষেই নয়- জুলির মধুমাখা কণ্ঠে ছিল যাদুর ছোঁয়া। ওকে নিজের পাশে বসিয়ে কথা বলত নাজি।

এখন আর পুরনো নর্তকীদের ডাক পড়েনা। ঈর্ষার আগুণে পুড়ে মরতে লাগল ওরা। এ ঈর্ষার আগুন ওদের এতটাই ক্ষিপ্ত করলো যে, পুরনো নর্তকী দু’জন জুকীকে হত্যা করার পরিকল্পনা করল। কিন্তু কার্যত এ ছিল অসম্ভব। ওর কক্ষের সামনে সারাক্ষণ দু’জন প্রহরী দাঁড়িয়ে থাকত। অন্যদিকে অনুমতি ছাড়া নর্তকীরা বাইরে যেতে পারত না। অনেক ভেবেচিন্তে ওরা হারেমের এক চাকরাণীকে হাত করে নিল।

গভর্ণরের পুরনো বডিগার্ড বদলে দিলেন আলী। সেখানে নিয়োগ করলেন দুঃসাহসী এবং আত্মত্যাগী নতুন সৈন্য। ওদের প্রত্যেকেই ছিল একেকজন আদর্শ সৈনিক। নাজি এ পরিবর্তন মেনে নিতে না পারলেও আইয়ুবীর সামনে তা প্রকাশ করল না। সম্বর্ধনায় হাজির হওয়ার জন্য সে আবার আইয়ুবীকে অনুরোধ করল। আইয়ুবী বললেন, ‘কবে আপনার দাওয়াতে যেতে পারব দু’ একদিনের মধ্যেই আপনাকে তা জানাবো।

নাজি চলে গেলে তিনি এ ব্যপারে আলীর পরামর্শ চাইলেন। আলী বললেন, ‘যে কোন সময় আপনি নাজির নিমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পারেন। পরদিন সালাহউদ্দীন নাজিকে জানালেন, তিনি এখন তার দাওয়াত কবুল করতে প্রস্তুত। নাজি তিন দিন সময় নিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করার অনুমতি প্রার্থনা করলে আইয়ুবী সানন্দে তাতে সম্মতি দিলেন।

অনুমতি পেয়ে নাজি আড়ম্বরপূর্ণ এক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করল। অনুষ্ঠানটি হবে শহর থেকে দূরে। মশাল জ্বেলে আলোর ব্যবস্থা করা হবে। ব্যবস্থা থাকবে নাচগানের। ঘোড়সওয়াররা তাদের নৈপুণ্য দেখাবে। মশালের আলোয় অনুষ্ঠিত হবে কুস্তি, নেজাবাজি এৰং তলোয়ারের খেলা। রাতে ওখানেই সবার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তৈরী করা হয়েছে আলীশান তাঁবু। পুরো অনুষ্ঠানমালা জানানো হল সালাহউদ্দীনকে। তিনি মনযোগ দিয়ে বিস্তারিত কর্মসূচী শুনলেন কিন্তু নাচগান সম্পর্কে কিছুই বললেন না। এতে নাজি উৎফুল্ল হল। মনে মনে সাহস সঞ্চয় করে ভয়ে ভয়ে বলল, ‘সেনাবাহিনীর বেশীর ভাগ ফৌজ দুর্বল মুসলিম। ওরা কখনো সখনো মদপান করে, তবে অভ্যস্ত নয়। আপনাকে সম্বর্ধনা জানানোর এ আনন্দঘন অনুষ্ঠানে ওরা সামান্য পদ পানের অনুমতি চাইছে।’

‘এ ব্যাপারে আমি কিছু বলতে চাই না। আপনি আমাকে দাওয়াত করেছেন, আমি সে দাওয়াত কবুল করেছি। ওখানে আপনি কি করবেন তা আপনিই ভাল বুঝবেন। আপনি ওদের কমাণ্ডার। ইচ্ছে হয় অনুমতি দেবেন, না হয় দেবেন না, আমি এ ব্যাপারে আপনাকে কোন নির্দেশ দেব না।’ ‘মিসরেবর আমীরের জয় হোক।’ আনন্দে গদগদ হয়ে মোসাহেবী কণ্ঠে বলল নাজি। ‘যে কাজ আপনি অপছন্দ করেন আমি তার অনুমতি দেয়ার কে? নেহায়েত আপনাকে উপলক্ষ করে ওরা একটু আনন্দ করতে চাইছে, নইলে এ প্রস্তাব আমি কিছুতেই উঠাবার দুঃসাহস করতাম না।’

সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানের সংবাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। শুনল সালাহউদ্দীনের কর্মচারীরাও। আইয়ুবী নাচগান এবং মদের অনুষ্ঠানে যাবেন শুনে ওরা হতভম্ব হয়ে গেল। চাইতে লাগল একে অপরের দিকে। কেউ বলল, ‘নাজি মিথ্যে বলে সকলকে চমৎকৃত করতে চাইছে।’ কারো ধারণা, ‘নাজি সালাহউদ্দীনকেও হাত করে নিয়েছে।’

এ সংবাদে সবচে বেশী খুশী হল নাজির লোকেরা। দায়িত্বগ্রহণ করার পরপরই সালাহউদ্দীন আইয়ুবী ভোগবিলাস এবং নাচগান নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। সেনাবাহিনীর জন্য কঠোর নিয়ম পালন বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। এ নিয়ম ভাঙার দুঃসাহস কারো ছিল না। সালাহউদ্দীন আজ নাচগান এবং মদের অনুমতি দিয়েছেন, কাল নিজিেই এতে অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন, এই ভেবে নাজি মহা খুশী।

কেবলমাত্র আলী বিন সুফিয়ান জাতেন এর গূঢ় রহস্য। এছাড়া আর কেউ জানতো না, কেন নাজিকে অনুষ্ঠানে নাচগান আর মদ পরিবেশনের অনুমতি দেয়া হয়েছে। রাত নেমেছে। থোকা থোকা জোসনা ঝরে পড়ছে মরুর বালুকারাশির ওপর। হাজার হাজার মশালের আলোয় দিনের মত উজ্জ্বল মনে হচ্ছে সমগ্র এলাকা। প্রশস্ত ময়দানের একপাশে ফৌজ সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। বিপরীত দিকে সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর বসার স্থান। যেন কোন সম্রাটের মসনদ। মসনদের ডানে বায়ে চেয়ার সাজানো। একটু দূরে অতিথিদের তাঁবু। আরেকটু সরে গিয়ে বিশাল এক তাবু তৈরী হয়েছে সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর অবকাশ যাপনের জন্য।

সূর্য ডোবার পূর্বেই আলী বিন সুফিয়ান ওখানে পৌঁছে তাঁবুর চারপাশে কড়া পাহারা বসালেন। অন্যদিকে নাজি শেষ বারের মত জুলিকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিচ্ছিল। নজরকাড়া রূপ লাবণ্যে জুলিকে মনে হচ্ছিল স্বর্গের অপ্সরা। তার দেহ থেকে ছড়িয়ে পড়ছিল হালকা সুবাস। সে সুবাসে পরিবেশ হয়ে উঠছিল অপূর্ব মোহনীয় ও মাদকতাময়। তার নিরাভরণ কাঁধে সোনালী চুলের বাহার। শরীরে পোষাকের স্বচ্ছ প্রলেপ। সে প্রলেপের ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছিল এক অনুপম শিল্প সুষমা। সে সুষমায় ছিল মাখন কোমল এক মোমের পুতুলের জীবন্ত সজীবতা। ঠোঁটে তার অনির্বচনীয় মুচকি হাসি।

Leave a Reply